ইসলামে মাতৃভাষা চর্চা

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:৪২
আবু তালহা রায়হান

মানুষের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের ধ্বনিকে ভাষা বলে। ভাষার উদ্ভব ও উৎস সন্ধানে ভাষাতাত্ত্বিকদের অনুসন্ধানী করেছে বটে; কিন্তু ভাষার আবির্ভাব তত্ত্বের কোনো সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য আবিষ্কার করা যায়নি। নানা ধরনের থিওরি বা তত্ত্ব আবিষ্কারের মোদ্দাকথা হচ্ছে, ভাষা আল্লাহপ্রদত্ত দান। এর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালা। পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষার মধ্যে থেকে প্রত্যেক জাতিরই স্বীয় ভাষা রয়েছে। ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অপরিসীম গুরুত্বের সঙ্গে মাতৃভাষাকে স্মরণ করে ইসলাম। মাতৃভাষা শিক্ষা ও বিকাশে ইসলামের রয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। আমরা বাঙালি। আমাদের মাতৃভাষা বাঙলা। পৃথিবীতে বাঙলাই একমাত্র ভাষা যার মর্যাদা আদায়ে মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অসংখ্য মায়ের কোল খালি হয়েছে। জগতের এ এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। অতএব মাতৃভাষাকে রূপে-গুণে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে আমরা নিজেরা বিশুদ্ধভাবে ভাষা ব্যবহার করাসহ সর্বস্তরে বাঙলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিশ্বখ্যাত মূল্যবান গ্রন্থগুলো মাতৃভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করারও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পবিত্র কোরআন থেকে জানা যায় যে, ইসলামী আদর্শ যেমন সর্বজনীন, ইসলামের ভাষাও সর্বজনীন। এ কারণেই দেখা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ইসলাম প্রচারকগণ পৃথিবীর যে অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে গেছেন, সেই অঞ্চলের মানুষের ভাষা আয়ত্ত করে সে ভাষাতেই ইসলামের সুমহান বাণী তাদের কাছে তুলে ধরেছেন। ভাষা স্বয়ং মহান আল্লাহর নিদর্শনরাজির অন্যতম। পবিত্র  কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে হলো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা।’ (সুরা আর রূম, আয়াত-২২) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশের ভঙ্গি।’ (সুরা আর রাহমান, আয়াত-৩, ৪) মাতৃভাষা চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি রাসুলগণকে স্বজাতির ভাষা দিয়েই প্রেরণ করেছি, যেনো তাঁরা আপন জাতিকে সুষ্ঠুভাবে বোঝাতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত-৪)

দীনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার সঙ্গে বিশুদ্ধভাষী হওয়াও জরুরি। হজরত মুসা (আ.)-এর মুখে জড়তা ছিল। হজরত হারুন (আ.) সালাম তাঁরচে’ অধিক বিশুদ্ধভাষী ছিলেন। তাই হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে  দরখাস্ত করেছিলেন, ‘আর আমার ভাই হারুন আমারচে’ অধিক বিশুদ্ধভাষী। সুতরাং তাঁকে আমার সহায়ক হিসেবে আমার সঙ্গে নবুওয়াত দান করুন। সে আমাকে সত্য প্রতিপন্ন করবে। আমি আশঙ্কা করি তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করবে।’

প্রিয়নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাজিল হয়েছে আমাদের  হেদায়াতের জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠগ্রন্থ আল  কোরআনুল কারীম। আর তা হচ্ছে আরবি ভাষার সর্বাধিক বিশুদ্ধরূপ। স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ছিলেন সবচেয়ে বিশুদ্ধ আরবি ভাষী। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আনা আফসাহুল আরব।’ (আমি আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক।) দৈনন্দিন জীবনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। ভাষার ব্যবহারে তিনি অশুদ্ধতা ও আঞ্চলিকতা এড়িয়ে চলতেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে হাজারো হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসগুলো আমাদের কাছে হুবহু পৌঁছেছে। এগুলো তো আর কেউ সম্পাদনা করে সংকলন করেনি। অথচ বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে আরবি ভাষা ও এসব হাদিস সবার উপরে; বরং হাদিস গবেষকগণ কোনো হাদিস মাওজু বা জাল কিংবা বানোয়াট কি-না তা পরিচয়ের ক্ষেত্রে একটা নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, কোনো অশুদ্ধ শব্দ থাকলে সেটা মাওজু ও জাল বলে পরিগণিত হবে। সম্ভবত এসব দিক বিবেচনায় উলামারা বলেন, ‘নিজ ভাষায়ও বিশুদ্ধ কথা বলা সুন্নত।’ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় নিজ ভাষায় বিশুদ্ধ কথা বলতেন। আরবি ভাষা আরবদের জন্য যেমন দীনি ভাষা তেমনি তা তাদের মাতৃভাষাও বটে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এই ভাষায় শুধু যিকির-আযকার,  কোরআন তেলাওয়াত করতেন এমন নয়, তাঁদের দৈনন্দিন সব কাজকর্মও এই ভাষায়ই সম্পন্ন হতো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাঁদেরকে শব্দচয়নেও সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ‘রায়িনা’ বলো না-‘উনজুরনা’ বলো এবং শোনতে থাকো।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত-১০৪)

হাদিস শরিফেও আমরা লক্ষ করি যে, সাহাবিদের দৈনন্দিন কাজকর্মেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাষার বিশুদ্ধতা, উপযুক্ত শব্দচয়ন ইত্যাদির প্রতি তাগিদ করেছেন। একবার জনৈক সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন। তিনি বাহির থেকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আ-আলিজু?’ প্রবেশ করা অর্থে এই শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় ব্যবহার হয়। কিন্তু অনুমতি কিংবা প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে ‘আ-আদখুলু?’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ‘আ-আদখুলু’ বলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে তার শব্দপ্রয়োগ ঠিক করেছেন। অথচ তা যিকির-আযকার বা এ জাতীয় কোনো কিছু ছিল না। (সহিহ মুসলিম শরিফে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফায’ নামীয় শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শব্দপ্রয়োগ সংশোধন করেছেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা এশার নামাজকে ‘আতামা’ বলো না, বরং ‘ইশা’ বলো।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ‘আঙুরকে’ ‘করম’ বলো না, ’ইনাব’ বলো।’

ইমাম আহমদ (র.) তার কলিজার টুকরো কন্যাকে বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষাদানের প্রতি বেশ গুরুত্বারোপ করতেন। ভুল হলে তাকে শাস্তিও দিতেন। বস্তুত মুসলিম মননে মাতৃভাষাপ্রীতি সঞ্চারিত হয়েছে ইসলামের মাতৃভাষার ওপর অত্যাধিক গুরুত্বারোপের কারণে। সুতরাং মাতৃভাষার স্বকীয়তা রক্ষা করা অপরিহার্য বিষয়। পবিত্র কোরআন-হাদিস তথা ইসলামের আলোকে ধর্মপ্রাণ মানুষের সৎ মনোভাব প্রকাশের দ্বারা মাতৃভাষার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, ইসলাম প্রচারে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা এবং সর্বোপরি বিশ্বমানবতার কল্যাণে মাতৃভাষার চর্চা, অনুশীলন ও সংরক্ষণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
 
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক
abutalha625616@gmail.com

মন্তব্য লিখুন :