বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে

১৫ মার্চ ২০২১, ১৫:০০
আমিরুল ইসলাম লুকমান

হালাল পণ্য মুসলমানদের জীবনের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। হালাল পণ্য, বিশেষত হালাল খাদ্য ব্যতীত মুসলমানদের জীবনযাপন করা দুষ্কর। আল্লাহতায়ালার কোনো প্রিয় বান্দা জেনে-বুঝে হারাম খাদ্য ও অপবিত্র খাবার ভক্ষণ করতে পারেন না। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশত, সেই পশু যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম উচ্চারিত হয়েছে, শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, উপর হতে পতনে মৃত জন্তু, অন্য কোনো পশুর শিংয়ের আঘাতে মৃত জন্তু, হিংস্র পশুতে খেয়েছে এমন জন্তু, তবে যা জবাই করেছ, তা ছাড়া এবং সেই জন্তুও হারাম, যাকে প্রতিমার জন্য বেদীতে বলি দেওয়া হয়।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত- ৩)

শরিয়তের বিধিনিষেধের কারণেই মুসলিম জাতি হালাল-হারামের বাছবিচার করে থাকেন। একজন পরিশুদ্ধ ও চরিত্রবান মানুষের জন্য হালাল পণ্য আবশ্যক। হারামের ভেতরে কখনোই কোনো সৌন্দর্য, সভ্যতা ও পবিত্রতা থাকতে পারে না। কিন্তু এ কথা সত্য, পৃথিবীব্যাপী হালাল পণ্য খুবই দুষ্প্রাপ্য। এখনো ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অমুসলিম সংখ্যাগুরু দেশে হালাল পণ্য খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এসব দেশে বসবাসরত ও ভ্রমণরত মুসলমানদের হালাল পণ্য ও খাদ্য সংগ্রহে সীমাহীন কষ্ট ভোগ করতে হয়।

তবে আশার কথা হলো, বিগত কয়েক বছর যাবত সারা বিশ্বে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের খাদ্য চাহিদার শতকরা ১৬ ভাগ রয়েছে হালাল খাদ্যের দখলে। হালাল পণ্যের চাহিদা শুধু খাদ্যসামগ্রীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রি, ব্যাংকিং সেক্টর থেকে শুরু করে ওষুধ ও কসমেটিক সামগ্রী পর্যন্ত হালাল পণ্যের চাহিদা খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সামপ্রতিক এক গবেষণা মতে, আগামী কয়েক বছরের ভেতর হালাল পণ্যের বাজার চার ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। ইসলামি বিধিসম্মত হালাল পণ্যের চাহিদা বর্ধিত হওয়ার অন্যতম কারণ, ইসলামি বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নতি ও ইসলামি দেশসমূহে অবস্থানরত ও আগত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী একশত ষাট কোটির অধিক এমন মানুষের বসবাস রয়েছে, পূর্বপুরুষদের চেয়ে যাদের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। শুধু আমেরিকার মুসলমানদের বাৎসরিক ক্রয়ক্ষমতা আনুমানিক ১৭০ বিলিয়ন ডলার! দ্রুত ক্রমবর্ধমান হালাল পণ্যের লাভজনক এই বাজারে ইতিমধ্যে টেসকো, নেসলে, ম্যাকডোনাল্ডের ন্যায় পৃথিবীখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরবকে হালাল মুরগি সরবরাহ করে ব্রাজিল, আর নিউজিল্যান্ড রাপ্তানি করে থাকে ইসলামি বিধিমোতাবেক জবাইকৃত ছাগলের হালাল গোশত। তেমনি ব্রিটেন এবং কানাডার ঔষধ রপ্তানিকারক কোম্পানি হালাল ঔষধ ও ভিটামিন তৈরি করছে। ইসলামি বিশ্বে সামপ্রতিককালে হালাল কসমেটিক এবং স্ক্রিন প্রোডাক্টের চাহিদাও দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাপানের রাজধানী টোকিওতে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনী-২০১৪’ বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত ফরুখ আইমাল। উক্ত প্রদর্শনীতে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আগত খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানী, গবেষক, বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার, রাষ্ট্রদূত, সংগঠন ও খাদ্য উদ্যোক্তাগণ অংশগ্রহণ করেন। প্রদর্শনীতে জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও আরব আমিরাতের ষাটের অধিক কোম্পানি নিজেদের তৈরি হালাল পণ্য প্রদর্শন করে। প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল, জাপানের পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে হালাল পণ্য প্রস্তুতকরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং জাপানে ভ্রমণকারী ও বসবাসরত মুসলমানদের সহজে হালাল পণ্য সরবরাহ করতে পারা। সাথে সাথে পণ্যের হালাল সার্টিফিকেট, হালাল পণ্য তৈরির মেশিন ও প্রকৌশল, হালাল পণ্যের কাঁচামাল আদান-প্রদান সহজকরণের বিষয়টি সেমিনারে গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। হালাল পণ্যের কারখানা ও আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সমুদ্রের উপকূলে ব্যবস্থাপনা করার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রদর্শনীতে শুধু খাদ্য ও পানীয় নয়, বরং গৃহস্থালীসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যেরও প্রদর্শনী হয়।

হালাল পণ্যের চাহিদার ব্যাপারটি সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অবশ্যই আশাব্যঞ্জক সংবাদ। যদিও পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, বাহরাইন, সুদান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কিছু কিছু দেশ ও সংগঠন বেসরকারিভাবে হালাল পণ্য উৎপাদন, নির্ণয়, ও মাননিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগেই শুরু করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যাপক পরিসরে মুসলিম দেশ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের হালাল পণ্য উৎপাদনের নেতৃত্ব দেওয়া ও সমগ্র বিশ্বকে হালাল পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে পথ প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি।

হালাল পণ্যের আমদানি-রপ্তানির উপর মুসলমান ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সমপ্রদায়ের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। যেখানে তারা হালাল পণ্যের ব্যবসা বিস্তার করতে পারবেন, মুনাফার সাথে সাথে হারাম ধ্বংস করা ও হালাল পণ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সীমাহীন সাওয়াবও লাভ করবেন। মুসলমানদের হালাল পণ্যের অবশ্যিক চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে লাভবান হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তাদের সামনে উপস্থিত। অমুসলিম দেশ ও অমুসলিম ব্যবসায়ীদের হালাল পণ্যের প্রতি আগ্রহ থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের শিক্ষা নিয়ে পূর্ণ উদ্দ্যোমে এগিয়ে যাওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। (শরিয়া এন্ড বিজনেস অবলম্বনে)

মন্তব্য লিখুন :